ইস্তিখারার নামাজের নিয়ম ও দোয়া — বিয়ের সিদ্ধান্তে

বিয়ের মতো বড় সিদ্ধান্তে মানুষ দ্বিধায় পড়ে — প্রস্তাবটা ভালো, কিন্তু মনে পুরো স্বস্তি আসছে না; অথবা দুটো প্রস্তাবের মধ্যে কোনটা বেছে নেবে, বুঝতে পারছে না। এমন সময়ের জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ একটি সুন্দর আমল শিখিয়েছেন: ইস্তিখারা, অর্থাৎ আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া।

ইস্তিখারা কী

ইস্তিখারা মানে আল্লাহর কাছে এই দোয়া করা — যে কাজটা করতে যাচ্ছি, সেটা যদি আমার দ্বীন, দুনিয়া আর পরিণামের জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে তা সহজ করে দাও; আর যদি অকল্যাণকর হয়, তাহলে আমাকে তা থেকে ফিরিয়ে নাও। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের সব বিষয়ে ইস্তিখারা শেখাতেন, যেভাবে কুরআনের সুরা শেখাতেন। (সহিহ বুখারি)

ইস্তিখারার নিয়ম

  1. অজু করে ফরজ নয় এমন দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ুন। (নিষিদ্ধ ওয়াক্ত, যেমন সূর্যোদয়, ঠিক দুপুর ও সূর্যাস্তের সময় এড়িয়ে চলুন।)
  2. সালাম ফেরানোর পর আল্লাহর প্রশংসা করুন ও দরুদ পড়ুন।
  3. তারপর নিচের দোয়াটি পড়ুন। দোয়ার যেখানে “هَذَا الْأَمْرَ” (এই কাজ) আছে, সেখানে মনে মনে নির্দিষ্ট বিষয়টি স্মরণ করুন — যেমন “অমুকের সাথে আমার বিয়ে”।

ইস্তিখারার দোয়া

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ، فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلَا أَقْدِرُ، وَتَعْلَمُ وَلَا أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ. اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ، وَاقْدُرْ لِيَ الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِي بِهِ.

অর্থ: হে আল্লাহ, আমি তোমার জ্ঞানের মাধ্যমে তোমার কাছে কল্যাণ চাই, তোমার শক্তির মাধ্যমে তোমার কাছে সামর্থ্য চাই, আর তোমার মহান অনুগ্রহ প্রার্থনা করি। কারণ তুমি সক্ষম, আমি অক্ষম; তুমি জানো, আমি জানি না; আর তুমিই অদৃশ্যের সব খবর জানো। হে আল্লাহ, যদি তুমি জানো যে এই কাজটি আমার দ্বীন, আমার জীবিকা ও আমার পরিণামের জন্য কল্যাণকর, তাহলে এটি আমার জন্য নির্ধারণ করে দাও, সহজ করে দাও, তারপর এতে বরকত দাও। আর যদি তুমি জানো যে এই কাজটি আমার দ্বীন, জীবিকা ও পরিণামের জন্য অকল্যাণকর, তাহলে এটিকে আমার থেকে ফিরিয়ে নাও, আমাকেও এটি থেকে ফিরিয়ে নাও, আর যেখানেই কল্যাণ আছে তা আমার জন্য নির্ধারণ করো, তারপর আমাকে তাতে সন্তুষ্ট করো। (সহিহ বুখারি)

আরবি দোয়া পড়তে না পারলে বাংলা অর্থ মনে রেখে নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে একই কথা চাইতে পারেন; তবে শিখে নিয়ে মূল দোয়া পড়াই উত্তম।

ইস্তিখারা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

  • “স্বপ্নে উত্তর আসবে।” স্বপ্ন দেখা ইস্তিখারার শর্ত নয়। হাদিসে স্বপ্নের কথা নেই; অনেকে স্বপ্নের অপেক্ষায় সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখেন — এটা ঠিক নয়।
  • “শুধু মনের অনুভূতিই উত্তর।” অনুভূতি একটা দিক, কিন্তু আলেমরা বলেন, ইস্তিখারার পর কাজটা এগিয়ে নিন; আল্লাহ যদি কল্যাণ রাখেন, পথ সহজ হবে, আর না রাখলে বাধা আসবে।
  • “অন্য কেউ আমার হয়ে ইস্তিখারা করে দেবে।” মূল সুন্নাহ হলো যার বিষয়, সে নিজে ইস্তিখারা করবে। বাবা-মা নিজেরা দোয়া করতে পারেন, কিন্তু টাকা নিয়ে “ইস্তিখারা করে দেওয়া” সুন্নাহর পদ্ধতি নয়।
  • “ইস্তিখারা মানে খোঁজখবর লাগবে না।” ইস্তিখারা খোঁজখবর আর পরামর্শের বিকল্প নয়। আগে যাচাই করুন, অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিন (ইস্তিশারা), তারপর ইস্তিখারা।

বিয়ের সিদ্ধান্তে ইস্তিখারা কখন

যখন খোঁজখবর নেওয়া হয়ে গেছে, দুই পরিবার কথা বলেছে, পাত্র-পাত্রীর আলাপও হয়েছে — কিন্তু চূড়ান্ত “হ্যাঁ” বলার আগে। এর আগের ধাপগুলোর জন্য দেখুন বিয়ের আগে ২০টি প্রশ্ন আর অভিভাবকের গাইড।

একবারে মনে স্বস্তি না এলে কয়েকদিন ইস্তিখারা চালিয়ে যাওয়া যায়। আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন — যা হবে, তাতেই কল্যাণ আছে।

এই লেখায় সহিহ হাদিসে বর্ণিত পদ্ধতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। বিস্তারিত মাসআলার জন্য নিজ এলাকার নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন।

যা জানতে চান

ইস্তিখারার পর কি স্বপ্ন দেখা জরুরি?

না। হাদিসে স্বপ্নের কথা নেই। ইস্তিখারার পর কাজটি এগিয়ে নিন; কল্যাণ থাকলে আল্লাহ পথ সহজ করবেন।

ইস্তিখারা কি অন্য কেউ করে দিতে পারে?

মূল সুন্নাহ হলো যার বিষয়, সে নিজে ইস্তিখারা করবে। বাবা-মা নিজেরা দোয়া করতে পারেন।

কতবার ইস্তিখারা করা যায়?

একবারে মনে স্বস্তি না এলে কয়েকদিন চালিয়ে যাওয়া যায়।