বিয়ের আলাপে দেনমোহর নিয়ে কথা বলতে অনেক পরিবার সংকোচ করে — কেউ ভাবে বেশি চাইলে খারাপ দেখায়, কেউ ভাবে “লেখা থাকলেই হলো, দিতে তো হবে না।” দুটো ধারণাই ভুল। দেনমোহর ইসলামে স্ত্রীর অধিকার, আর বাংলাদেশের আইনেও এটা স্বামীর আদায়যোগ্য দায়।
এই লেখায় দেখানো হলো: দেনমোহর কী, ইসলাম কী বলে, কত হওয়া উচিত, নগদ ও বাকি দেনমোহরের পার্থক্য, আর বাংলাদেশের আইন কী বলে।
দেনমোহর কী
দেনমোহর (মোহর) হলো বিয়ের সময় স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে দেওয়া বাধ্যতামূলক সম্পদ বা অর্থ। এটা স্ত্রীর একান্ত নিজস্ব সম্পদ — বাবা-মা, অভিভাবক বা স্বামী কেউ এর মালিক নন।
ইসলাম কী বলে
আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “আর তোমরা নারীদের তাদের মোহর খুশিমনে দিয়ে দাও। তবে তারা যদি সন্তুষ্টচিত্তে এর কিছু অংশ ছেড়ে দেয়, তাহলে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করো।” (সুরা আন-নিসা, ৪:৪)
এই আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার:
- মোহর দেওয়া স্বামীর ওপর ফরজ, এটা দয়া বা উপহার নয়
- মোহরের মালিক স্ত্রী নিজে
- স্ত্রী চাইলে স্বেচ্ছায়, কোনো চাপ ছাড়া, কিছু অংশ বা পুরোটা মাফ করতে পারেন — কিন্তু কেউ তাঁকে বাধ্য করতে পারে না
দেনমোহর কত হওয়া উচিত
শরিয়তে মোহরের কোনো সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। হানাফি মাযহাবে ন্যূনতম পরিমাণ দশ দিরহাম (রুপার নির্দিষ্ট ওজন)। এক সাহাবির কাছে মোহর দেওয়ার মতো কিছু ছিল না; রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বলেছিলেন, “একটা লোহার আংটি হলেও খুঁজে দেখো।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম) — অর্থাৎ মোহর হতে হবে স্বামীর সামর্থ্যের মধ্যে, বাস্তবে আদায়যোগ্য।
বাস্তবে দেনমোহর ঠিক করার সময় যা দেখা হয়:
- পাত্রের সামর্থ্য: যা সত্যিই দিতে পারবেন, তা-ই লিখুন
- পারিবারিক প্রথা: কনের পরিবারে সাধারণত কেমন মোহর হয় (ফিকহে একে “মহরে মিসিল” বলা হয়)
- নগদ অংশ: বিয়ের সময় কতটা দেওয়া সম্ভব
একটা প্রচলিত ভুল হলো, “লোক দেখানোর জন্য” বিশাল অঙ্ক লেখা, এই ভেবে যে দিতে হবে না। অথচ কাবিনে যা লেখা হয়, তার পুরোটাই শরিয়ত ও আইন দুই দিক থেকেই স্বামীর দায়। আদায়ের নিয়ত ছাড়া মোহর লেখা নিয়ে আলেমরা কঠোর সতর্ক করেছেন।
নগদ ও বাকি দেনমোহর
| নগদ (তাৎক্ষণিক) | বাকি (বিলম্বিত) | |
|---|---|---|
| কখন দিতে হয় | বিয়ের সময়, বা স্ত্রী চাওয়ামাত্র | নির্ধারিত সময়ে; সময় লেখা না থাকলে বিবাহবিচ্ছেদ বা মৃত্যুর মাধ্যমে বিয়ে শেষ হলে |
| কাবিনে | কত পরিশোধ হলো, তা আলাদা লেখা হয় | বাকি অঙ্ক আলাদা লেখা হয় |
সম্ভব হলে বিয়ের সময় পুরো মোহর, অন্তত বড় অংশ নগদে দিয়ে দেওয়াই উত্তম — এতে দায় ঝুলে থাকে না।
বাংলাদেশের আইন কী বলে
- মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (ধারা ১০): নিকাহনামা বা বিয়ের চুক্তিতে দেনমোহর কীভাবে পরিশোধ হবে তা নির্দিষ্ট করা না থাকলে, পুরো দেনমোহর চাওয়ামাত্র পরিশোধযোগ্য ধরা হয়।
- পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫: দেনমোহর আদায় না হলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন।
- যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮: দেনমোহর আর যৌতুক এক নয়। মোহর স্বামী দেন স্ত্রীকে; আর কনের পক্ষের কাছে যৌতুক চাওয়া বা নেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
দুই পরিবারের জন্য পরামর্শ
- দেনমোহর নিয়ে আলোচনা খোলামেলা করুন — লজ্জার কিছু নেই, এটা শরিয়তের বিধান
- অঙ্ক ঠিক করুন পাত্রের বাস্তব সামর্থ্য দেখে
- নগদ কত আর বাকি কত — স্পষ্ট করে কাবিনে লিখুন
- বাকি মোহর থাকলে পরিশোধের একটা সময়সীমা ঠিক করা ভালো
- কাবিনের বাকি ঘরগুলোও মন দিয়ে পড়ুন — দেখুন কাবিননামা কী, কোন ঘরে কী লেখা হয়
এই লেখা সাধারণ ধারণা দেওয়ার জন্য — এটা আইনি বা শরয়ি পরামর্শ নয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শরয়ি প্রশ্নে নিজ এলাকার নির্ভরযোগ্য আলেম, আর আইনি প্রশ্নে আইনজীবীর পরামর্শ নিন। আইন ও বিধি সময়ের সাথে বদলাতে পারে।