কাবিননামা কী, কোন ঘরে কী লেখা হয়

বিয়ের দিন অনেক আনন্দ আর ব্যস্ততার মধ্যে একটা কাগজে সই হয় — কাবিননামা। অনেকেই না পড়ে সই করে ফেলেন। অথচ এই কাগজই বিয়ের আইনি প্রমাণ, আর এতে লেখা শর্তগুলো সারা জীবন দুজনের অধিকার ঠিক করে দেয়।

এই লেখায় সহজ ভাষায় দেখানো হলো: কাবিননামা কী, কেন নিবন্ধন জরুরি, এতে কী কী তথ্য থাকে, আর সই করার আগে কী কী মিলিয়ে দেখবেন।

কাবিননামা কী

কাবিননামা (নিকাহনামা) হলো সরকার নির্ধারিত ফরমে লেখা মুসলিম বিয়ের দলিল, যা নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) নিবন্ধন করেন। এতে বর-কনে, অভিভাবক, সাক্ষী, দেনমোহর আর বিয়ের বিশেষ শর্তগুলো লেখা থাকে।

নিবন্ধন কেন জরুরি

  • আইনের বাধ্যবাধকতা: মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী প্রতিটি মুসলিম বিয়ে নিবন্ধন করতে হয়; নিবন্ধন না করা দণ্ডনীয়।
  • স্ত্রীর অধিকারের সুরক্ষা: দেনমোহর, ভরণপোষণ বা উত্তরাধিকারের দাবিতে কাবিনই প্রধান প্রমাণ।
  • সন্তানের পরিচয়: জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্টসহ নানা কাজে বিয়ের প্রমাণ লাগে।
  • প্রবাসে যাওয়া: স্ত্রীকে বিদেশে নিতে সাধারণত নিবন্ধিত বিয়ের সনদ লাগে।

কাবিননামায় কী কী থাকে

অংশকী লেখা হয়
বর ও কনের পরিচয়নাম, বাবার নাম, ঠিকানা, বয়স
অভিভাবক ও উকিলকনের অভিভাবক, আর সম্মতি আদায়কারী উকিলের নাম
সাক্ষীসাক্ষীদের নাম ও ঠিকানা
দেনমোহরমোট অঙ্ক, কতটা নগদ পরিশোধ হলো, কতটা বাকি
বিশেষ শর্তদুই পক্ষের সম্মতিতে যোগ করা শর্ত
তালাকের ক্ষমতা অর্পণস্বামী স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিয়েছেন কি না, দিলে কোন শর্তে (তালাক-ই-তাফবিজ)
বরের বর্তমান বিয়েবরের আর কোনো স্ত্রী আছে কি না, থাকলে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য সালিশি পরিষদের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না
নিবন্ধনের তথ্যবিয়ের তারিখ, নিবন্ধনের তারিখ, রেজিস্ট্রারের সই ও সিল

বিয়ের বয়স

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী বিয়ের ন্যূনতম বয়স নারীর জন্য ১৮ আর পুরুষের জন্য ২১ বছর। কাবিনে বয়স লেখার সময় জন্মনিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে মিলিয়ে নিন।

সাক্ষী

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বিয়ে শুদ্ধ হতে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের মুসলিম পুরুষ — অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী — সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব-কবুল হতে হয়।

সই করার আগে যা মিলিয়ে দেখবেন

  1. সব নাম, বয়স আর ঠিকানা সঠিক কি না। একটা বানান ভুল পরে পাসপোর্ট বা ভিসার কাজে বড় ঝামেলা তৈরি করে।
  2. দেনমোহর অঙ্কে ও কথায় লেখা, আর নগদ-বাকি আলাদা করে লেখা। না লেখা থাকলে আইনে পুরো দেনমোহর চাওয়ামাত্র পরিশোধযোগ্য ধরা হয় — বিস্তারিত দেখুন দেনমোহর লেখায়।
  3. তালাকের ক্ষমতা অর্পণের ঘর। এটা ফাঁকা থাকবে, নাকি শর্তসহ অধিকার দেওয়া হবে — দুই পরিবার আগে থেকে আলোচনা করে ঠিক করুন; রেজিস্ট্রারের ইচ্ছায় বা তাড়াহুড়োয় কাটাকাটি নয়।
  4. বিশেষ শর্ত। যা মুখে বলা হয়েছে, এমন গুরুত্বপূর্ণ শর্ত থাকলে লিখিত আছে কি না।
  5. রেজিস্ট্রার বৈধ কি না। সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার দিয়েই নিবন্ধন করান।
  6. সনদের কপি নিন। নিবন্ধনের পর কাবিনের সত্যায়িত কপি বর ও কনে — দুই পক্ষই সংগ্রহ করুন।

প্রচলিত ভুল

  • না পড়ে সই করা
  • “পরে করব” বলে নিবন্ধন পিছিয়ে রাখা
  • দেনমোহরের ঘরে নগদ কত দেওয়া হলো, তা ভুল বা বাড়িয়ে লেখা
  • কনের সম্মতি সরাসরি না নিয়ে শুধু অভিভাবকের কথায় সই
  • কাবিনের কপি সংরক্ষণ না করা

এই লেখা সাধারণ ধারণা দেওয়ার জন্য — এটা আইনি পরামর্শ নয়। কাবিননামার ফরম, নিবন্ধন ফি ও বিধি সরকার সময়ে সময়ে বদলাতে পারে; সর্বশেষ নিয়ম নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে জেনে নিন, আর নির্দিষ্ট আইনি প্রশ্নে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

যা জানতে চান

বিয়ে নিবন্ধন কি বাধ্যতামূলক?

হ্যাঁ। মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী প্রতিটি মুসলিম বিয়ে নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হয়, আর নিবন্ধন না করা দণ্ডনীয়।

বাংলাদেশে বিয়ের ন্যূনতম বয়স কত?

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী নারীর জন্য ১৮ আর পুরুষের জন্য ২১ বছর।

কাবিনে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ মানে কী?

স্বামী শর্তসহ বা শর্ত ছাড়া স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অধিকার অর্পণ করতে পারেন (তালাক-ই-তাফবিজ)। এই ঘরটি কীভাবে পূরণ হবে, দুই পরিবার আগে থেকে আলোচনা করে ঠিক করা উচিত।

কাবিনের কপি কোথায় পাব?

নিবন্ধনের পর নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে সত্যায়িত কপি নিন; বর ও কনে দুই পক্ষই একটি করে সংগ্রহ করে রাখুন।